সকালে, হঠাৎই, কী কারণ কে জানে-- মাথার মধ্যে কতগুলো শব্দ ভেসে উঠল। কথাগুলো এ-রকম: ‘গোটা দেশজোড়া বারণাবত’।
 |
এই সেই ছবি। প্রথম পাতা, আনন্দবাজার, ১৮ জুন ২০২২। |
স্রেফ এইটুকুই। এবং, মনে-মনে বলা মাত্র, টের পেলাম, একটা স্পষ্ট ছন্দ লুকিয়ে রয়েছে শব্দগুলোর ভেতরে। মাত্রাবৃত্ত। সময় একটু যেতে না যেতে বোধ হল, এ যেন-বা একটা তিন-চার স্তবকওলা কবিতা, বিধাতার পাঠানো সন্দেশ, যার প্রথম স্তবকের শেষ লাইন ‘গোটা দেশজোড়া বারণাবত’, আবার দ্বিতীয় স্তবকের প্রথম লাইন ওই ‘গোটা দেশজোড়া বারণাবত’-ই। ছন্দটা পুরো শরীরে চারিয়ে গেল ক্রমশ-- হয়তো এখনও, মানে যখন এ-লেখা লিখছি, টুকরো টুকরো ছন্দ পাওয়া যাবে শরীর খুঁড়লে পাওয়া যাবে।
কিন্তু, বিধাতার অসীম করুণা: কবিতাটা এল না শেষ অবদি।
আজ আঠেরোই জুন, কলকাতায় ঝিরঝিরে বৃষ্টি, এলোমেলো ছাঁট, আকাশ গুম-মারা মেঘলা। কালও এমন বৃষ্টি হয়েছিল বিকেলে, আর, জয়ের ওই কবিতাটা আধো-মেঘের ভেতর মনে পড়ছিল বার বার: যেখানে বৃষ্টি স্তিমিত, আকাশে কিছু মেঘপিণ্ড ভাসমান, মাছ-ধরা ছেলের দল মাছ নিয়ে ঘরে ফিরছে, আর এমন গোধূলিমুহূর্তে কবি জিগ্যেস করছেন কোনও এক গৃহবন্দিকে: ‘এখনও কি ইচ্ছে করে তোমার, ওদের সঙ্গে যেতে?’ পরের অমোঘ, বিদ্যুচ্চমকিত লাইন– ‘কয়েদি উত্তর দেয় না। সে কেবল বিকেলটুকু এঁকে রাখছে ঘরের মেঝেতে!’ সূর্য-পোড়া ছাই-এর এই লাইনগুলো মনে আসছিল এলোমেলো, আকাশে তখন বৃষ্টিশেষের মেঘ সাজানো, আর স্তিমিত স্বরে, বাইরের নাগরিক কোলাহলের ভেতর আমার ঘরের হাঁ-মুখো স্পিকার বাজাচ্ছে শপা-র নকটার্ন নম্বর ৩, অথবা ৪। যেন পিকচার পারফেক্ট দৃশ্য-- মৃদু পিয়ানো, আর একটি সজল বিকেলবেলা।
আজও হল তেমনই৷ বাইরে মেঘল আকাশ, সঙ্গতে সামান্য বৃষ্টি, আর ভেতকোঠায় আশ্চর্য আনন্দমুহূর্ত, যার নকশাটা ঠিক ঠাহর করতে পারছি না। মনে হচ্ছে, যেন বা সব লুকোনো প্রবৃত্তি তার আদিম মাছটুকু ধরে ফেলেছে।
আচমকা, হবি-তো-হ, চোখের সামনে ভেসে উঠল আজকের সদ্য-পড়ে-ফেলা আধবাসি আনন্দবাজারের প্রথম পাতাটা। গোটাটা নয় অবশ্য। স্রেফ, একটা ছবি। বিহারে অগ্নিপথ-বিরোধী বিক্ষোভে জ্বলতে থাকা আগুনমুখো ট্রেনের ছবি। কারণ ছাড়াই। বাইরে এক চিলতে বারান্দা, ভেতরের গহন কোনও অঞ্চলে অস্বাভাবিক, তুরীয়, প্রকাশ-অসম্ভব এক আনন্দ, অথচ, লাইনগুলো ভেসে আসছে মেঘল হাওয়ায়। সেই লাইন বড় বিষণ্ণ, বড় নতমুখ-- ছুটে আসছে আগুন-লাগা প্যাসেঞ্জার ট্রেনের নিয়তির মতো– কী একটা তীব্র ছন্দের শরীর ধারণ করে।
ধুয়ো উঠছে দেশময়, শরীরজোড়া: ‘গোটা দেশজোড়া বারণাবত/ গোটা দেশজোড়া বারণাবত’। মনে হল আমার, কোন এক প্রাজ্ঞ ঋষি সেই পুরাকাল থেকে একটি মাত্র স্তব উচ্চারণ করতে করতে কবিতার শেষ লাইনটিতে অমোঘ এসে দাঁড়িয়েছেন– যে সত্য উন্মোচিত হয়ে গেছে আজ, এই ঘোর কলিযুগে, ২০২২ সালে– লাইনটি কেবল এই: ‘গোটা দেশজোড়া বারণাবত’। তার সঙ্গে একটা ছন্দ, সর্পিল ও ধিকিধিকি আগুনের মত লংশটে ছড়িয়ে যাচ্ছে সমস্ত দেশব্যাপী, খাক করে দিচ্ছে আমার শরীর।
বাইরে বৃষ্টি পড়ছে। হতোদ্যম। কেবল, কবিতাটা এল না আর। কী যেন বলতে চাওয়ার ছিল, বলাও হল না। কেবল ওই মুহূর্ত জানে ছন্দটা আর সত্যিটা: 'গোটা দেশজোড়া বারণাবত।'
১৮ জুন ২০২২
পুনশ্চ এই লাইনের ভেতর কেউ শঙ্খ ঘোষের 'গোটা দেশজোড়া জউঘর' কবিতাবইটির নামের অনুরণন দেখতেই পারেন। কিন্তু, আমার অনেক বেশি করে মনে হচ্ছে ওঁর 'ভিখিরির আবার পছন্দ' কবিতাখানা, তার ছন্দটুকু। 'গোটা দেশজোড়া...'-য় ব্যবহৃত অক্ষরবৃত্তের বদলে, যেখানে ফুটে ওঠে মাত্রাবৃত্তের যুদ্ধসাজ। 'ভাঙবার শুধু সময় চাই।/ এ রাস্তা থেকে ও রাস্তায়/ হব ক-দিনের বাসিন্দা/ কে না জানে সব অনিত্য/ কে না জানে সব অনিত্য/ নিয়ে যাই তাই খড়কুটো/ বেঁচে যে রয়েছি এই-না ঢের/ ভিখিরির আবার পছন্দ!'
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন