বৃ ষ্টি বি কে ল
১
মালবিকা কানন ম্যাজিক জানেন। কথাটা অবশ্য প্রথম ভাবছি না। এর আগেও, ওঁর গলায় ছায়ানটে আগরা আর রামপুর-সাহসওয়ান ঘরানার বন্দিশ 'ঝনন ঝনন বাজে বিছুয়া' শুনেও একই কথা মনে হয়েছিল। কিঞ্চিৎ দ্রুত লয়ের গান থেকে মালবিকা কানন খুলে নেন যাবতীয় জড়োয়া, আর লয়কে করে দেন ঈষৎ ঢিমে। তাতেই ঘটে যায় অভাবিত সমস্ত ম্যাজিক। সিদ্ধ জাদুকর যেমন মিহি সন্তর্পণে তাঁর আস্তিনের রুমাল থেকে টেনে আনেন খরগোশ-- মালবিকা কাননের গান শুনলেও, আমি নিশ্চিত, মনে হতে পারে: এ রকমই ছিল তবে বন্দিশের চেহারাটা? ছায়ানটের বহিরঙ্গের ভেতর তবে এত দিন ঘাপটি মেরে ছিল এমনই শান্ত ও সমাহিত সুন্দরতা, এমন নিস্পন্দ আবহ, এমন তুলোট কাগজের মত ভেসে যাওয়া সুরের প্রাণায়াম? কী করে জানতাম রাগের এমন অপ্রত্যাশিত গড়ন-- মালবিকা কানন কখনও না-চিনিয়ে দিলে?
২
একই ভাবে, গৌড় মলহার রাগটাও এসেছে আমার কাছে, নানা চেহারায়। গৌড় মলহারকে মনে হয় বৃষ্টি-ফুরিয়ে আসা স্নাত বিকেলের রাগ। আকাশে পায়চারি করছে ভাসমান মেঘখণ্ড, ইতস্তত। সদ্য বর্ষায় ফুটে ওঠা বাগানের ফুলটির মতই, এই রাগে থেকে থেকে জানান দেয় মালবিকা কানন আর মীরা বন্দ্যোপাধ্যায়ের গলার সজলতা। গত কাল গৌড় মলহার শুনছিলাম ওঁর আর মীরা বন্দ্যোপাধ্যায়ের গলায়। কেন কে জানে, এঁদের গলায় গৌড় মলহার শুনলে মনে পড়ে যায় শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের 'আনন্দভৈরবী', দুয়ের ভেতর আপাত কোনও সংযোগ না-থাকা সত্ত্বেও।
৩
অবশ্য, কেবল শক্তি একাই নন। গৌড় মলহারের সাকিন চিনে রাখেন জয় গোস্বামী-ও।
১৯৯৯। শতাব্দীর শেষ চৌকাঠে দাঁড়িয়ে আছে বাংলা কবিতা। যে-জয় দেড় দশক আগে লিখে ফেলেছেন 'উন্মাদের পাঠক্রম', তিনিই লিখবেন এখন 'সূর্য-পোড়া ছাই'। শতকের শেষ সন্ধিসময়। যে সময় মহাজগৎ-জুড়ে পড়ে থাকে অজস্র পরিত্যক্ত খণ্ড হাড়, খণ্ড উরু। সমস্ত তারামণ্ডল ও গ্রহচরাচরব্যাপী ছেয়ে থাকে অমোঘ কোনও কুরক্ষেত্র।
এ-বইয়ের কবিতাগুলো আকারে ছোট, নামহীন, এবং সংখ্যাচিহ্নিত। গড়ে, খুব বেশি হলে, আট লাইন।
তারই ফাঁকে, একটি কবিতায়, বিদ্যুচ্চমকের মত, মিশে রয়েছে গৌড় মলহার। কাল মালবিকা কাননের ওই ঈশ্বরীসমান নিবেদন শুনতে শুনতে সেই কবিতার তবক খুলে গেল আমার সামনে, দৃষ্টি স্পষ্ট হয়ে এল। কবিতাটি এ-বইয়ের প্রতিনিধিত্বমূলক রচনা বলে মনে করি না। তবু, এ-কবিতায় কান রাখলেই কখনও শোনা যাবে গৌড় মলহারের বুকের কাঁপনটুকু:
পশ্চিমে বাঁশবন। তার ধারে ধারে জল।বিকেল দাঁড়াল ধানক্ষেতে।
জলে ভাঙা ভাঙা মেঘ। ফিরে আসছে মাছমারা বালকের দল।
খালি গা, কোমরে গামছা, লম্বা ছিপ, ঝুড়ি–
আবছা কোলাহল।তোমার কি ইচ্ছে করে, এখন ওদের সঙ্গে যেতে?
কয়েদি উত্তর দেয় না। সে শুধু বিকেলটুকু
এঁকে রাখছে ঘরের মেঝেতে!
১৯ জুন ২০২২
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন