আমরা অঢেল শান্তি চাই
আজ্ঞে মাননীয় এবং মাননীয়ারা-- সুশীল এবং সুশোভিত-- বাংলা আকাদেমিক এবং নন-আকাদেমিক-- খবর জানেন নিশ্চয়ই, রোদ্দুর রায় বলে একটা লোক গ্রেফতার হয়েছে। কী সব গাঁজাটাজা খেয়ে খিস্তিখাস্তা করেছিল, তাও আবার কি-না, ছি ছি, দিবি তো দে, সোজা দিদিকে। আরে ধম্মাবতার, বলুন এত পাপ কোথায় রাখে লোকটা, দাড়িতে না মাথায়, বগলে না পেছনে-- এই দেখুন শালা খারাপ কথা বলে ফেলছি, না না এ সব বলব না, আপনারা তো জানেনই আমার মুখ ভীষণ পরিষ্কার, আমার পেছন ভীষণ পরিষ্কার, আমি খারাপ কথা বলি না, দিদির নামে তো আরওই না। কোথাকার বাচাল পাবলিক জুটেছে ভাই, নিজে ইউটিউব খুলেছিস খোল, হাসি কর মজা কর প্রমোদ কর জলসা কর, কে বারণ করছে। আফটার অল আমাদের রাজ্যের তো এটাই বিধান, আমরা ২৭৫ দিন বন্ধ রাখি ইস্কুল, আমাদের রাজ্যে পড়াশুনো মানে ডুমুরের ফুল, কিন্তু অত সিরিয়াস কথা বলে কী হবে ভাই? খালি নেগেটিভিটি, দুত্তোর। তাচ্চেয়ে সিরিয়াল দেখ পারলে। সিরিয়াস না হলেই হল।
কী বদ লোক শালা, তুমি যে রাজ্যের বাসিন্দা তারই নামে গালিগালাজ করো, তারই নির্বাচিতা মুখ্যমন্ত্রীর নামে অসভ্য ভিডিও ছাড়ো ইউটিউবে। তুমি মহিলাদের সম্মান জানো না, গলা নামিয়ে কথা বলতে হয় শেখো নি, জানোই না মদন মিত্রকে সব সময় সম্বোধন করতে হয় শ্রীলশ্রীযুক্ত মদন মিত্র মহাশয় বলে, বাপ-মা শেখায় নি তোমায় শালা। রাজ্যের নির্বাচিত মিনিস্টার, সুদীপ্ত সেনের ক্রাইম ইন পার্টনার, আর তুমি এরম বিশ্ববিখ্যাত সেলিব্রিটিকে বলছ 'মদনা'? কোথাকার সংস্কৃতি এটা, ভাই? আজ তোমার দম হবে তো বস, ধরো আমাদের সরকার যদি তোমায় সাড়ে সাত বছর জেলের গহনে পুষে রাখে, তো দাদার মত বীরবিক্রমে, মিনিমাম কুইকুইটুকু না-করে, বীর স্বাধীনতা সংগ্রামীর ন্যায়, নীরবে, দেশের আইনের প্রতি গভীর শ্রদ্ধাবশত কারাবরণ করার?
ছাগল তুমি শালা। আলতুফালতু কেস খেলে। গোয়া অবদি গেলে, আর কানের ট্রিটমেন্ট করাতে দুবাই যেতে পারলে না? চাঁদ উঠেছিল গগনে কম্পোজ করতে পারলে, আর দিদির মতো স্যাটাস্যাট ও তুরন্ত লিখতে পারলে না এপাং অপাং ঝপাং? কী তবে প্রতিভা তব? এই মানিক-বিভূতি-তারা-মাইকেল-খচিত সুবোধ বঙ্গদেশে তুমি একটা বাজে, বদ, বেখাপ্পা, প্রয়োজনহীন। আমরা সে রকম সেলেব পছন্দ করি যারা নিম্নাসন থেকে সবিনয়ে, ভীতচকিত, হাত কচলানিবৎ শুধোতে পারে কোমল স্বরে, 'মাননীয়া! আমাদের তরফে এই সামান্য রিট্রিভারশিপ পারিতোষিকটুকু কি গ্রহণ করবেন মাননীয়া?' আমরা সে রকম বিদ্দ্বজ্জন পছন্দ করি যারা মস্তিষ্ক বন্ধক রেখে নিযুক্ত হন বিদ্যাচর্চায়, বিনিময়ে বছরান্তে লভিয়া থাকেন ভিসিপদ ও কমিটিসুধা। আমরা সে রকমই বিরোধীপক্ষ পছন্দ করি যারা ফেসবুক করে নিয়মিত, হাসে এবং আনন্দ পায় বসুধার সকল ঘটমানতায়। আমরা পছন্দ করি ফিশফ্রাই-খাওয়া অপোনেন্ট, যারা বছরে এক বার মহাকরণ যায় আর ঘটনাস্থলের লাইভ বিবরণরূপে ফেসবুকে স্টেটাস আপডেট দেয় মুহূর্তে মুহূর্তে। তবে মাথায় রাখতে হবে যেন ওই নবান্নযাত্রা বছরে একের বেশি দু-বার না হয়, কারণ এগুলো মহাজাগতিক ক্যালেন্ডারে ঠিক করা থাকে যে বছরে এক বারই হবে, দুগগাপুজোর মত।
দেখো ভাই, আমরা সে রকমই রাজ্য পছন্দ করি যেখানে লোকে ১৭৮ দিন বা তারও বেশি অসহ্য গরমে লোকে রাজভবনের গা-বরাবর শুয়ে থাকে চাকরি পাবে বলে। মধ্যদুপুরে কলকাতা ঝলসায় আগুনে, রোদে, অসহ তাপ ও প্রবল নিশ্চেতন ঘুমে। আমরা পছন্দ করি বছরে সাড়ে সাত কোটি উৎসব, কলেজে কাট্মানি, বিধবা ভাতা ও সান্ধ্য সোপ অপেরা। আমরা চাই না লোকে আমাদের বিরুদ্ধে লিখুক, বলুক, বা বললেও এমন স্বরে বলুক যাতে পাড়াপ্রতিবেশীর ঘুম ভেঙে যায়।
আমরা অঢেল শান্তি চাই। তাতে ভবিষ্যৎ চুলোর দুয়ারে গেলে যাক।
১৫ জুন ২০২২
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন